রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৬




ইয়াকীনের প্রকারভেদ

পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে ইয়াকীনের স্তর তিনটি। এক. আইনুল ইয়াকীন, দুই. ইলমুল ইয়াকীন, তিন. হাক্বুল ইয়াকীন।
আইনুল ইয়াকীনঃ যে জ্ঞান কিতাবে বা প্রকৃতিতে আমরা দেখতে পাই বা শুধু বাহ্যিকভাবে চোখে দেখে ও শুনে বিশ্বাস করি বা মেনে নেই, সেই জ্ঞানের উপর এরকম ইয়াকীনকে আইনুল ইয়াকীন বলে। যেমনঃ রসগোল্লা মিষ্টি, গোলাকার, রসালো ও সাদা বর্ণের - এইটুকু জানা ও বিশ্বাস করা আইনুল ইয়াকীন।
ইলমুল ইয়াকীনঃ যে জ্ঞান কিতাবে বা প্রকৃতিতে আমরা দেখতে পাই এবং শুধু দেখে বা শুনে নয়, বরং সেই জ্ঞান সম্পর্কে আমরা অধ্যয়ন করে সেই জ্ঞানের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করি, সেই জ্ঞানের উপর এরকম ইয়াকীনকে ইলমুল ইয়াকীন বলে।
যেমনঃ রসগোল্লা মিষ্টি, গোলাকার, রসালো ও সাদা বর্ণের - এইটুকু জানাই যথেষ্ট নয়, বরং রসগোল্লা কিনে এনে, ভেঙে, মুখে দিয়ে, খেয়ে আমরা রসগোল্লা সম্পর্কে যে ধারণা অর্জন করি, তা ইলমুল ইয়াকীনের অন্তর্ভূক্ত।
হাক্বুল ইয়াকীনঃ যে জ্ঞান কিতাবে বা প্রকৃতিতে দেখে, পড়ে, গবেষণা করে উহার বাহির ও ভিতর সম্পর্কে জানার পর যে ইয়াকীনের জন্মলাভ করে, উহাই হাক্বুল ইয়াকীন।
যেমনঃ রসগোল্লা খাওয়ার পর ইলমুল ইয়াকীনের জ্ঞান অর্জন করে ঐ জায়গায় বসে না থেকে, আমরা যদি রসগোল্লার কারিগরের কাছে গিয়ে, কিছু সময় ব্যয় করে রসগোল্লার সমস্ত উপাদান দিয়ে নিজে রসগোল্লা তৈরী করা শিখতে পারি, তাহলে এই জ্ঞানকেই বলা হবে হাক্বুল ইয়াকীন। এই জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান বা আসল জ্ঞান। এই জ্ঞানের ভিত্তিই ইস্পাতদৃঢ় হয়, যা থেকে জ্ঞানী ব্যক্তিকে কেউ সামান্যতম টলাতে পারবে না। অর্থাৎ, রসগোল্লার কারিগরকে কেউ যদি বলে যে, রসগোল্লা মিষ্টি নয় তেতো বা লবনাক্ত, তাহলে কারিগরকে সে তার জীবনভর বুঝালেও কোন ফল হবে না। ঠিক তেমনি যারা হাক্বুল ইয়াকীনের স্তরের জ্ঞানী, তাঁদের কাছে নিম্নতর দুই জ্ঞানের অধিকারীগণ যতই বুঝানোর চেষ্টা করুক না কেন, তা অবুঝ শিশুর আব্দারের মতই মনে হবে। অপরদিকে, কোন বিদেশী লোককে যদি বলা হয়, গোল্লা দেখতে গোল, রসালো, সাদা ও মিষ্টি, তাহলে সে এটা শুনে বিশ্বাস করবে। কিন্তু, যদি অপর কোন ব্যক্তি, যাকে সে পূর্বের লোকটির চেয়ে বেশী বিশ্বাস করে, সে যদি বলে যে, রসগোল্লা মিষ্টি নয় লবনাক্ত, তাহলে অতি সহজেই সে সেটাই সঠিক বলে মেনে নেবে। এই স্তরের ইয়াকীন কচুপাতার পানির মত, যার কোন স্থায়ীত্ব নেই। এধরণের ইয়াকীন বিশিষ্ট ঈমান যে কোন সময় হরণ করা শয়তানের বা তার দোষরদের পক্ষে অতি সহজ।
আর প্রথম দুই প্রকার ইয়াকীন হাসিলকে যারা যথেষ্ট মনে করে, তাদেরকে আল্লাহ্ পাক তৃতীয় স্তরের ইয়াকীন, অর্থাৎ হাক্বুল ইয়াকীনের স্বাদ আস্বাদন করান না। এজন্যই হয়তো হাক্বুল ইয়াকীনের সর্ব্বোচ্চ মাকাম অর্জনকারী হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) নিজেকে জ্ঞানের শহর এবং হযরত আলী (রাঃ) কে সেই শহরের দরজা বলেছেন। আর সেই কারনেই হয়তো হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন, “আমি যদি প্রকৃত জ্ঞান প্রকাশ করি, তাহলে আমাকে কতলের নির্দেশ (প্রথম দুইপ্রকারের ইয়াকীন বিশিষ্ট অহংকারী বা জ্ঞানপাপী ব্যক্তিরা) জারি করবে।”
মানুষের জ্ঞানের ধারণ ক্ষমতার তারতম্যের কারণেই রাসূলে পাক (সাঃ) বলেছেন, “হে আলী! তুমি প্রত্যেককে তার জ্ঞানের পরিধি অনুযায়ী জ্ঞান দান করবে, নতুবা সে তোমাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করবে।” নবীজীর (সাঃ) এই বাণীর সপক্ষে হাজার হাজার উদাহরণ ও জ্বলন্ত প্রমাণ আমরা সবাই কমবেশী প্রত্যক্ষ করি। এজন্যই হয়তো হযরত আলী বলেছেন,“যে জানে না সে প্রশ্ন করে, যে কম জানে সে উত্তর দেয়, আর যে বেশী জানে সে চুপ থাকে ; কারণ সে জানে যে নির্বোধের প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায় না।” এছাড়া আল্লাহ্ পাক ফরমান, “যে ব্যক্তি চুপ থাকলো, সেই মুক্তি পেলো” এখানে চুপ থাকা ব্যক্তিরাই হলেন হাক্বুল ইয়াকীন বিশিষ্ট ঈমানদার। ভরা কলস যেমন শব্দ করে না, তেমনি এধরণের ব্যক্তিবর্গ স্থূলজ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিদের মত স্বল্প ও বাহ্যিক জ্ঞানের অহংকারে মত্ত হয়ে নাচানাচী করেন না; বরং প্রকৃত অবস্থা জানার পরও নাচানাচী করেন না।
নমরূদের আগুন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর হাক্বুল ইয়াকীনকে এক চুলও নড়াতে পারেনি। হযরত মানসুর হাল্লাজের (রহঃ) হাক্বুল ইয়াকীনকেও ঠিক তেমনি এক চুলও নড়াতে পারেনি তাকে কতলের নির্দেশ জারির পরও।
বর্তমান আধুনিক সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার যুগে বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের পিছনে রয়েছে বিজ্ঞানীদের ইলমুল ইয়াকীন। বিজ্ঞানীরা এই ইয়াকীন লাভ করে নব নব আবিষ্কার করছেন। তারা এই জ্ঞানের মাধ্যমে জিনিষকে শুধু রুপান্তর করতে পারছেন। কিন্তু সেই জিনিষের মূলে পৌছাতে পারছেন না।
এবং ইসলামের নির্ধারিত পথ ব্যতিত তারা তা পারবেনও না। কিন্তু আল্লাহ্ পাকের নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাগণ সেই জিনিষের প্রকৃত রহস্য বা জ্ঞান আল্লাহর ইচ্ছায় লাভ করেন। কোরআন পাকে হযরত খিজির (আঃ) এর ঘটনা বা হযরত সোলাইমান (আঃ) এর মন্ত্রী আসফ বরখিয়ার চোখের পলক ফেলার আগেই রাণী বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসা - এসব ঘটনাই সাধারণ মানুষ বা তথাকথিত অসাধারণ মানুষ যথাঃ রাজা-বাদশাহ্, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিক, রাজনৈতিক নেতৃবর্গ, ধনকুবের প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের সাথে তাদের পার্থক্য নিরুপণ করে। সাধারণ মানুষ কেন, বড় বড় বিজ্ঞানীরা যাদের আমরা অসাধারণ মানুষ মনে করি, তাদেরও জ্ঞানের পরিধির বাইরে এসকল ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করে।
শুধুমাত্র অনুমান ভিত্তিক যে জ্ঞান অর্থাৎ আইনুল ইয়াকীনের অধিকারী ব্যক্তিদের পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। এদের সত্য-অসত্য, ভাল-মন্দ বোঝার ক্ষমতা নেই, চতুর ও দুনিয়াদার লোকেরা এদের যেভাবে চালায়, এরা সেইভাবেই চলে। সত্যাশ্রয়ী মহামানবের সন্ধান পাওয়া বা তাঁদের সন্ধানের জন্য সচেষ্ট হওয়া থেকে তাদের ফিরিয়ে রাখে শয়তান ও তার দোষররা। ফলে উভয়েই ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
এসম্পর্কে পা কোরআনে আল্লাহ্ পাক শয়তানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “কিসে তোকে বাঁধা দিল আদমকে সিজদা করতে ? যাকে আমি নিজ হাতে তৈরী করেছি। তুই অভিশপ্ত, যা তুই নেমে যা নিম্নদেশে,”
শয়তান বলল, “হে আল্লাহ ! আপনার ইজ্জতের কসম, যার জন্য আজ আমাকে গোমরাহ্ করলেন, তার বংশধরদের সবাইকে আমি আমার পথে নিয়ে আসব, কেবলমাত্র আপনার গুটিকতক খাস বান্দা ব্যতীত।” আল্লাহ্ জবাব দিলেন,“অবশ্যই আমি তোকে ও তোর অনুসারিদের দ্বারা জাহান্নাম পরিপূর্ণ করিব, আর আমার খাস বান্দাদের উপর তোর কোন প্ররোচনাই সফলকাম হইবে না।”
তাহলে দেখা যায় যে, সৃষ্টির আদিতেই আম ও খাস অর্থাৎ সাধারণ ও বিশেষ ব্যক্তি আলাদা হয়ে গেছে।
শয়তানের উক্তিতে “সবাইকে” বলতে বেশীরভাগ মানুষকেই বুঝিয়েছে, আর “গুটিকতক” বলতে মুষ্টিমেয় মানুষকে বুঝিয়েছে। সাধারণ সব সময়ই বেশী হয়ে থাকে, আর অসাধারণ সবসময়ই কম হয়ে থাকে - এটাই সাভাবিক।
অতএব, আল্লাহ্ পাক আমাদের যেন গুটিকতকদের দলে রাখেন - এই আশা ও চেষ্টা করা উচিৎ। গুটিকতকদের দলে না ভিড়তে পারলেও যদি তাদেরকে ভালবাসা যায়, তাহলেও অন্তত আল্লাহ্ পাকের ক্ষমা পাওয়ার আশা করা যায়। আর যদি শয়তানের সাথে হাত মিলিয়ে গুটিকতকদের পিছনে আদাজল খেয়ে লেগে পড়ি, তাহলে শয়তানের সাথে অনন্তকাল বাস করতে হবে এতে কোন সন্দেহ নাই।
আল্লাহ্ পাক আমাদের সবাইকে হক বুঝার ও সরল পথে চলার তৌফিক দিন, আমীন।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন