রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৭

ইসলামে শরীয়ত ও তরীকত


মহাগ্রন্থ কোরআনপাকে সূরা মায়িদার ৪৮ নং আয়াতে রয়েছে, “আমি তোমাদের জন্য শরীয়ত (সাধারণ পথ) ও তরীকত (বিশেষ পথ) সুনির্দিষ্ট করেছি।”

আল্লাহপাক আরও ইরশাদ করেছেন, “আমি কি তাকে দুটো চোখ দেইনি ? এবং জিহ্বা ও দুটো ঠোট দেইনি ? বস্তুতঃ আমি তাকে দুটো পথ বাতলে দিয়েছি। অতঃপর সে ধর্মের ঘাটিতে প্রবেশ করেনি।” (সূরা আল্ বালাদিঃ ৮-১১)

অথচ আমরা নিজেকে আল্লাহর বান্দা দাবী করি, মহানবীর (সাঃ) উম্মত দাবী করি, কিন্তু সূরা মায়িদার ৪৮ নং আয়াত হতে প্রথমার্ধ গ্রহণ করে দ্বিতীয়ার্ধকে বাদ দিয়ে দিয়েছি। আক্ষেপ, শুধু বাদই নয় চরমতর ঘৃণাভরে শত্রুতা করে আসছি দ্বিতীয় অংশের সাথে। এটাই ইবলিস শয়তানের সবচেয়ে বড় ওয়াসওয়াসা। কিন্তু ইবলিসের এই ওয়াসওয়াসা সবার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

সৃষ্টির আদি হতেই আল্লাহপাক সাধারণ ও বিশেষ অর্থাৎ আম ও খাস পৃথক করে দিয়েছেন। যেমন আল্লাহপাক হযরত আদমকে (আঃ) সৃষ্টি করার পর সকল ফেরেস্তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদমকে সেজদা করার। ইবলিস শয়তান ব্যতীত সবাই সেজদা করেছিল। যদিও সে ছিল জ্বিন জাতী হতে। কিন্তু ফেরেস্তাদের সাথে থেকে কঠোর উবাদত ও রিয়াজতের মাধ্যমে সে সকল ফেরেস্তাদের সরদার হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিল।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, “আল্লাহ বললেনঃ হে ইবলিস, তোমার কি হলো যে তুমি সেজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে স্বীকৃত হলে না ? বললঃ আমি এমন নই যে, একজন মানবকে সেজদা করব, যাকে আপনি পঁচা কর্দম থেকে তৈরী ঠনঠনে বিশুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বললেনঃ তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। তুমি বিতাড়িত। এবং তোমার প্রতি ন্যায় বিচারের দিন পর্যন্ত অভিসম্পাত। সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে পুনরুথ্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ বললেনঃ তোমাকে অবকাশ দেয়া হলো। সেই অবধারিত সময় (কাল হাসর) উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত। সে বললঃ হে আমার পালনকর্তা, আপনি যেমন আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব। আপনার খাস বান্দাদের ব্যতীত। আল্লাহ বললেনঃ এটা আমা পর্যন্ত সরল পথ (খাস বান্দাদের অনুসৃত পথ)। যারা আমার খাস বান্দা, তাদের উপর তোমার কোন ক্ষমতা নেই; কিন্তু পথভ্রষ্টদের মধ্য থেকে যারা তোমার পথে চলে। তাদের সবার নির্ধারিত স্থান হচ্ছে জাহান্নাম।” (সূরা আল হিজরঃ ৩২-৪৩)

উপরোক্ত আয়াতে সুস্পষ্টভাবে খাস বান্দাদের উল্লেখ রয়েছে। আর পথভ্রষ্টদের উল্লেখও রয়েছে। খাস বান্দাদের উপর শয়তানের কোনই ক্ষমতা নেই একথা আল্লাহপাক সুস্পষ্টরূপেই বলেছেন।

এছাড়াও সূরা আরাফের ১১ থেকে ১৭ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছেঃ
“আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদের আকৃতি দিয়েছি। তারপর ফেরেশতাদেরকে বলেছি, ‘তোমরা আদমকে সিজদা কর’। অতঃপর তারা সিজদা করেছে, ইবলীস ছাড়া। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আল্লাহ বললেন, ‘কিসে তোমাকে বাধা দিয়েছে যে, সিজদা করছ না, যখন আমি তোমাকে নির্দেশ দিয়েছি’? সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে’।
আল্লাহ বললেন, ‘সুতরাং তুমি এখান থেকে নেমে যাও। তোমার এ অধিকার নেই যে, এখানে তুমি অহঙ্কার করবে। সুতরাং বের হও। নিশ্চয় তুমি লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত’। সে বলল, ‘সেদিন পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন, যেদিন তাদেরকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে’। আল্লাহ বললেন, ‘নিশ্চয় তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত’।
সে বলল, ‘আপনি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, সে কারণে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আপনার সরল পথে বসে থাকব।
‘তারপর অবশ্যই তাদের নিকট উপস্থিত হব, তাদের সামনে থেকে ও তাদের পেছন থেকে এবং তাদের ডান দিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে। আর আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না’।”

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, ইবলিস-শয়তান বাঁকা বা বক্রপথে বসে থাকবে না। সে বসে থাকবে সরল পথের উপর, যেন এপথে কেউ না এগুতে পারে। কারণ, সরলপথ একটিই, যা আল্লাহ পর্যন্ত গিয়েছে। আর অসংখ্য বক্রপথে শয়তানের অসংখ্য চেলাপেলারা বসে ডাকছে। সেডাকেই অধিকাংশ লোক সাড়া দিচ্ছে।

এবার আসা যাক আজকের মূল বিষয় ইসলামে শরীয়ত ও তরীকত সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) এবং মুসলিম মণীষিদের বাণীগুলোর উপর আলোচনায়।

ইসলামে শরীয়ত বলতে সেই সমস্ত বিধি-বিধানগুলোকে বুঝায়, যেগুলো মহান আল্লাহপাক প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সুনির্দ্দিষ্ট করেছেন। এককথায় মহানবী (সাঃ) নির্দেশিত জীবনবিধানই শরীয়ত, যা ইসলাম ধর্মাবলম্বী প্রতিটি মানুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য এবং যা সহজতর ইবাদত।

আর তরীকত মহানবীর (সাঃ) কর্ম, যা কষ্টকর এবং নিজেকে সাধনার আগুনে নিক্ষেপ করা। যেমনঃ নবীজির (সাঃ) জীবনের নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাত, ইসলামী রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, শরীয়া আইন-কানুন, আদেশ-নিষেধ - এই সবই ইসলামী শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত। আর নবীজির হেরা পাহাড়ের গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকা, ক্ষুধার তাড়নায় পেটে পাথর বাঁধা, সারাদিন ইসলাম প্রচার, বিরোধীদের আক্রমণ প্রতিহতসহ শরীয়তের যাবতীয় কাজ করার পর রাতে মসজিদে-নবুবীতে আহলুস্ সুফ্ফাদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রদান – এই সবই হলো তরীকতের উদাহরণ।

এপ্রসঙ্গে মহানবী (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, “শরীয়ত আমার বাণী, তরীকত আমার কর্ম এবং হাক্বীকত আমার অবস্থা বা রহস্য।”

হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাহঃ) বলেন, “শরীয়ত হলো - আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা, মহানবীর সুন্নতের অনুসরণ করা, দ্বীন-ইসলামের সত্যতার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষন না করা, গোনাহের কাজ হতে নিবৃত থাকা, আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকা, আল্লাহর দরবারে আনুগত্যের সাথে মাথানত করা, নিজের গোনাহ হতে সব-সময় তওবা করা।
আর তরীকত হলো - আল্লাহর নির্ধারিত ফরযগুলো আদায় করার পর আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা এবং সেজন্য সাধ্যমত আল্লাহর জিকিরে মগ্ন হওয়া। এর ফলে আল্লাহর প্রেম লাভ করা যায়।”

হাদীসে কুদসীতে রয়েছে, “নফল ইবাদতের দ্বারা আমার বান্দা যখন আমার নৈকট্য লাভে সচেষ্ট হয়, তখন আমি তার শ্রবণশক্তি হই - যাদিয়ে সে শুনতে পায় ; আমি তার দৃষ্টিশক্তি হই - যাদিয়ে সে দেখতে পায় ; আমি তার হাতে পরিনত হই - যাদিয়ে সে কাজ করে ; আমি তার পা হই - যাদিয়ে সে চলাফেরা করে ; আমি তার অন্তর হয়ে যাই - যাদিয়ে সে অনুধাবন করে ; আমি তার জিহ্বা হই - যাদিয়ে সেকথা বলে ; সে আমার নিকট যা কিছু প্রার্থনা করে - আমি তা-ই তাকে দান করি ; যখন সে আমার নিকট পানাহ চায় - আমি তাকে পানাহ দেই।

হাদীসে কুদসীতে রয়েছে, আল্লাহপাক বলেন, “আমি আমার বান্দার সাথে থাকি, যখন সে আমার জিকির করে এবং আমার দ্বারা তাঁর ঠোঁটদুটি নাড়াচাড়া করে।”
                                       (সহীহ আল্ বোখারী)

হাদীসে কুদসীতে আরও রয়েছে, “আল্লাহপাক বলেন, আমি আমার নেককার বান্দাগণকে এমন বস্তু দান করে থাকি, যা সাধারণ চোখ কেখনো দেখতে পায় না, সাধারণ কান কখনো তা শুনতে পায় না এবং সাধারণ মানুষের অন্তরে তো কোন সময় উহার কল্পনাও আসতে পারে না।”

এরূপ নেককার বান্দাগণ শরীয়তের ইবাদত এবং তরীকতের মহব্বত দ্বারা আল্লাহর মারেফতলাভে ধন্য হয়েছেন। শরীয়ত, তরীকত, হক্বিকত ও মারেফত নিয়েই মহানবীর (সাঃ) পূর্ণাঙ্গ জীবন। মূলত এই চারটি পিলারের উপরই পূর্ণাঙ্গ শরীয়তের অবস্থান।

হযরত ইমাম শায়খ আহমদ সেরহিন্দী (রাহঃ) তাঁর মকতুবাত শরীফে বলেছেন, “তরীকত শরীয়ত ভিন্ন অন্য কিছুই না। তরীকতের আদি আবিষ্কারক হযরত নবীয়ে করীম (সাঃ), তাঁর সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণ ছিলেন।”

মালেকী মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইমাম মালেক (রাহঃ) তাঁর জাদুত্তাকওয়া কিতাবে বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি তাসাউফ (আধ্যাত্মিক বিদ্যা) গ্রহণ করেছে অথচ ফেকাহ (শরীয়তের বিধি-বিধান সংক্রান্ত বিদ্যা) গ্রহণ করেনি সে জিন্দিক হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তি শুধু ফেকাহ গ্রহণ করেছে, তাসাউফ গ্রহণ করেনি সে ব্যক্তি ফাসেক হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তি ফেকাহ শাস্ত্র এবং তাসাউফ শাস্ত্র দুটোই গ্রহণ করেছে, কেবল সেই ব্যক্তিই সরল পথের সন্ধান পেয়েছে।

হানাফী মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা হযরত ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ) স্বয়ং আহলে বাইতের ইমাম হযরত জাফর আস্ সাদেকের (রাহঃ) হাতে বায়াত নিয়েছিলেন। তাঁর প্রণীত “আইনুল এলেম” কিতাবে তিনি বলেন, “খোদানাখাস্তা আমি যদি হযরত জাফর আস্ সাদেকের সান্নিধ্যে দুই বছর না কাটাতাম, তাহলে আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম।”

একদিন হযরত ইমাম জাফর আস্ সাদেক (রাহঃ) হযরত ইমাম আজম হানিফাকে (রাহঃ) প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা, বলুন তো কোন ব্যক্তি সবচেয়ে বুদ্ধিমান ?” উত্তরে ইমাম সাহেব বলেন, “যে ব্যক্তি ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করতে পারে, সেই সবচেয়ে বুদ্ধিমান।” উত্তর শুনে হযরত ইমাম জাফর আস্ সাদেক (রাহঃ) বলেন, “এটা তো চতুষ্পদ জন্তুর পক্ষেও সম্ভব। চতুষ্পদ জন্তু মাত্রই বুঝতে পারে কে তাকে আদর করে আর কে তাকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দেয়। যে তাকে আদর করে জন্তুটি তারই সান্নিধ্যে থাকতে চায় ; আর যে তাকে তাড়িয়ে দেয় , জন্তুটি তার কাছ থেকে দুরে থাকে।”
তখন হযরত ইমাম আবু হানিফা (রাহঃ) বললেন, “জনাব, তাহলে আপনিই বলে দিন যে কে সবচেয়ে বুদ্ধিমান।” তখন হযরত ইমাম জাফর আস্ সাদেক (রাহঃ) বলেন, “সেই সবচেয়ে বুদ্দিমান, যে দুইটি ভাল কাজ ও দুইটি মন্দ কাজের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে। তারপর অপেক্ষাকৃত বেশী ভালটি ও কম মন্দটি বেছে নেয় ; তারপর ধীরে ধীরে সেই কম মন্দটিকে পরিত্যাগ করে।”

একদিন তরীকতের বিখ্যাত বুজুর্গ হযরত ইব্রাহীম ইবনে আদহাম (রাহঃ) হযরত ইমাম আজম হানিফার (রাহঃ) সাথে দেখা করতে গেলেন। ইমাম সাহেবের মজলিশের আলেমগণ তাঁর প্রতি কিছুটা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকালে ইমাম সাহেব বলে উঠলেন, “সাইয়্যেদুনা ইব্রাহীম, আসুন”, অর্থাৎ, আমাদের সরদার ইব্রাহীম, আসুন। ইমাম সাহেবের সহচরেরা তাঁর প্রতি ইমাম সাহেবের এরূপ সম্মানজনক সম্ভাষণ শুনে বললেন, “ইনি এই সরদারী কেমন করে লাভ করলেন ?” জবাবে ইমাম সাহেব বললেন, “আমি জানি, তিনি সব-সময়ই আল্লাহপাকের ইবাদতে মশগুল থাকেন। আর আমরা তো সময় সময় অন্যের (গায়রূল্লাহ্) কাজেও মশগুল থাকি। অতএব, বুঝে নাও তিনি কিরূপ স্তরের লোক।”

হযরত ইব্রাহীম ইবনে আদহাম (রাহঃ) সম্পর্কে শায়খুল ইরাক হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রাহঃ) এর মন্তব্য - “বাতেনী এলমের আলেমদের সমস্ত এলমের চাবি হলেন ইব্রাহীম ইবনে আদহাম।” (এই মহান বুজুর্গ সম্পর্কে জানতে হলে পাঠ করুন তাযকেরাতুল আওলিয়া নামক গ্রন্থ)

ফেকাহ শাস্ত্রের আরেক ইমাম হযরত আহমদ ইবনে হাম্বল (রাহঃ) অধিকাংশ সময়ই কাটাতেন তরীকতের বিখ্যাত ইমাম ও আল্লাহর অলি হযরত বিশর ইবনে হারেস হাফীর (রাহঃ) সঙ্গে। ইমাম সাহেব তাঁর খুব ভক্ত ছিলেন। একদিন ইমাম আহমদের (রাহঃ) সহচরগণ তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি একজন বিজ্ঞ আলেম, মুহাদ্দেস, এবং মুজতাহিদ। ফেকাহ শাস্ত্রের প্রত্যেক বিষয়ে আপনি এমন অগাধ জ্ঞান রাখেন যে, বর্তমান যুগে আপনার সমকক্ষ কেউ নেই। তাসত্ত্বেও আপনি সবসময় একজন পাগলের পাছে ঘুরছেন, এতে কি আপনার মর্যাদার হানী হয় না ?” ইমাম সাহেব বললেন, “তোমরা যথার্থ বলেছ, যে কয়েকটি বিষয়ের নাম তোমরা নিয়েছ, সে কয়টি বিষয়ে অবশ্য আমি তাঁর চেয়ে বেশী জ্ঞান রাখি ; কিন্তু আল্লাহতা’লার পরিচয় জ্ঞান তিনি আমার চেয়ে অনেক বেশী লাভ করেছেন।”
হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রাহঃ) প্রায়ই তাঁর কাছে যেতেন এবং বলতেন, “আমাকে আমার পারওয়াদেগার সম্বন্ধে বলুন।”

কথিত আছে, হযরত বিশর হাফী (রাহঃ) বড় বড় স্তুপকৃত হাদীসের কিতাব অধ্যয়ন করে সব কিতাব মাটির নীচে পুতে ফেলেন। আর তিনি কখনো হাদীস বর্ণনা করেননি। তাঁর হাদীস বর্ণনা না করার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “হাদীস বর্ণনায় আমি আমার অন্তরে সম্মান ও সুখ্যাতি লাভের স্পৃহা অনুভব করি ; এই স্পৃহার অবসান ঘটলে অবশ্য বর্ণনা করতে পারি।”

হযরত বিলাল খাওয়াস (রাহঃ) নামে এক বুজুর্গ বলেন, “আমি একদিন বণী ইসরাইলদের এলাকা ভ্রমন করছি ; এমন সময় দেখলাম, একজন লোক আমার সাথে সাথে চলছেন। আমি ভাবলাম ইনি খিজির (আঃ) হবেন। আমি তাঁকে বললাম, আপনাকে খোদার কসম দিয়ে বলছি, দয়া করে বলুন আপনি কে ?”
তিনি বললেন, “আমি তোমার ভাই খিজির।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “ইমাম শাফেয়ী (রাহঃ) সম্বন্ধে আপনার কি মত ?” তিনি বললেন, “ইমাম শাফেয়ী আওতাদ শ্রেণীভুক্ত।” আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রাহঃ) সম্বন্ধে আপনার কি ধারণা ?” তিনি বললেন, “ইমাম আহমদ (রাহঃ) সিদ্দীক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। তারপর আমি জিজ্ঞাসা করলাম, বিশর হাফী (রাহঃ) সম্বন্ধে আপনি কিরূপ মত পোষণ করেন ?” তিনি বললেন, “বিশর হাফী এমন স্তরের লোক যে, তাঁর পরে আর তাঁর মত লোক আসবে না।”

বিশিষ্ট তাবে-তাবেইন হযরত জুন্নুন মিশরীর (রাহঃ) তাঁর যুগে একজন শ্রেষ্ঠ ওলীয়ে কামেল ছিলেন। রিয়াযত ও কারামতে তিনি অতি উচ্চস্তরে উন্নীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থাকে এমনভাবে গোপন রেখেছিলেন যে, তাঁর বাহ্যিক অবস্থা দেখে মিশরবাসীরা তাঁকে যিন্দীক (খোদাদ্রোহী) বলে আখ্যায়িত করত। কেউ তাঁকে কামেল অলি বলে বিশ্বাস করত না। তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সকলেই তাঁর বিরোধী ছিল।
যেরাতে তিনি দেহত্যাগ করেন, সেই রাতে মিশরের সত্তরজন অলী রাসূলেপাককে (সাঃ) স্বপ্নে দেখেন। নবীজি (সাঃ) তাঁদরেকে বললেন, “আল্লাহর বন্ধু জুন্নুন মিশরীর ইন্তেকাল আসন্ন, আমি তাঁর এস্তেকবালের জন্য এসেছি।” তাঁর ইন্তেকালের পর লোকে তাঁর ললাটে আরবী হরফে লেখা দেখতে পেল - “এই ব্যক্তি আল্লাহতায়ালার বন্ধু, আল্লাহতায়ালার ইশকের মধ্যে সে প্রাণদান করেছে ; সে আল্লাহর পথের শহীদ।” তাঁর জানাজা বহনকারীরা জানাজা কাঁধে তুলে নিলে একঝাক পাখি এসে একে অন্যের সাথে পাখা মিলিয়ে তাঁর জানাজার উপর ছায়া দিয়ে চরতে থাকে। তা দেখে সমগ্র মিশরবাসীরা লজ্জায় ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। তাঁর প্রতি যেসব অত্যাচার, উৎপীড়ন তারা করেছিল, তা থেকে তারা তওবা করে।

হযরত জুন্নুন মিশরীর (রাহঃ) সময়কালে কোন এক যুবক অলি-দরবেশেদের প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করত, তাদেরকে বিশ্বাস করত না। একদিন হযরত জুন্নুন (রাহঃ) তাকে ডেকে বললেন, “আমার এই আংটিটি অমুক রুটিওয়ালার কাছে বন্ধক রেখে আমার জন্য কিছু দীণার নিয়ে এসো।” যুবকটি রুটিওয়ালার কাছে আংটিটি নিয়ে গেলে, রুটিওয়ালা এক দিরহামের বেশী দিতে রাজী হলো না। যুবকটি আংটি নিয়ে ফিরে এলো। হযরত জুন্নুন মিশরী (রাহঃ) বললেন, “এবার এই আংটিটি সোনা-চাদীর ব্যবসায়ীর নিকট নিয়ে যাও।” যুবকটি তাই করলো। স্বর্ণ ব্যবসায়ী আংটিটির মূল্য এক হাজার দিরহাম দিতে চাইলে যুবকটি ফিরে এসে একথা জানালো। তখন হযরত জুন্নুন মিশরী (রাহঃ) যুবকটিকে বললেন, “সূফী এবং আওলিয়ায়ে কেরামের মর্তবা সম্বন্ধে তোমার জ্ঞান ঠিক সেইরূপ, যেরূপ আংটি সম্বন্ধে রুটিওয়ালার জ্ঞান।” একথা শুনে যুবকটি নিজের অজ্ঞতা অনুধাবন করতে পারলো এবং লজ্জিত হয়ে তওবা করলো। আর কখনো সে আওলিয়াকেরামদের অবজ্ঞা করেনি।

আওলিয়াকেরাম সম্বন্ধে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, “সাবধান! আল্লাহর আওলিয়াদের কোন ভয় নাই (ইহকাল ও পরকালে) এবং তাহাদের চিন্তান্বিত হওয়ারও কোন কারণ নাই। যারা ইমান এনেছে এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে। তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে এবং পারলৌকিক জীবনে। আল্লাহর কথার কখনো হেরফের হয়না। এটাই হলো মহা সাফল্য। আর তাদের (স্থুলবুদ্ধিসম্পন্ন লোকদের বা আওলিয়াকেরামের দুশমনদের) কথায় দুঃখ পেয়োনা। আসলে সকল ক্ষমতা আল্লাহর। তিনিই শ্রবণকারী ও সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল্ ইউনুসঃ ৬২-৬৫)

আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত নেককারদের সঙ্গলাভ করা নিয়ে পবিত্র কোরআনে রয়েছে, “আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহ নিয়ামত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গী হবে। তাঁরা হলেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাঁদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।” (সূরা আন্ নিসাঃ ৬৯)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন