সোমবার, ৮ আগস্ট, ২০১৬


আমার এই লেখাটি একটি দৈনিক পত্রিকায় “ইসলাম ও ঐতিহ্য” পাতায় ১০ নভেম্বর (শুক্রবার), ১২ নভেম্বর (রবিবার) ও ১৩ নভেম্বর (সোমবার) ১৯৯৫ তিনটি খন্ডে প্রকাশিত হয়েছিলঃ

মুমিনের কান্না ।। খোদা ভীরুতার পরিচয়

মানব মনের সুকোমল বৃত্তিগুলোর মধ্যে কান্না একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে । এই কান্নার পিছনে নানা কারণ লুক্বায়িত থাকে। শিশুরা সাধারনত ক্ষুধা পেলে কাঁদে, শারীরিক আরাম-আয়াসে বিঘ্ন ঘটলে কাঁদে, কাঙ্খিত বস্তু না পেলে কাঁদে ইত্যাদি । বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে কান্নার প্রবনতা অবদমিত হতে থাকে । শৈশবের মত সামান্য কারণে আর কান্না আসে না ।
কান্নাকে তখনই মনের সুকোমল অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ বলা চলে যখন সেই কান্নার জন্ম হয় পরকেন্দ্রিক আবেগ হতে - যেখানে ক্রোধ, জেদ, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, আত্ম অহমিকা, অর্থ-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিজনিত বেদনা প্রভৃতি সংকীর্ণ বিষয় থাকে অনুপস্থিত । আর পরকেন্দ্রিক আবেগ হতে যে কান্না জন্ম নেয়, তাহলো বিরহ ব্যথায় কান্না, অপরের দুঃখ-কষ্ট দেখে কান্না, কারো কোন অপকার করার পর ভুল বুঝতে পেরে বিবেকের দংশন জনিত কান্না প্রভৃতি ।
আত্মকেন্দ্রিক আবেগের স্তরে মানুষ যখন চরম কাঙ্খিত বস্তু লাভের আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে, সে মুহূর্তেও তার দুচোখ বেয়ে নেমে আসে আনন্দ অশ্রু । আপাত দৃষ্টিতে একে আনন্দ অশ্রু মনে হলেও প্রকৃত অর্থে এটাও মনের চোরাকুঠুরীতে সুপ্ত সুদীর্ঘ বাসনার বহিঃপ্রকাশ, যে বাসনা ক্রমে না পাওয়ার বেদনায় রূপান্তরিত হয়েছিল । তাই হয়তো মরমী কবি রূমী গেয়েছিলেনঃ
                 “তোমার পিরিত বেদনার অশ্রু যাহা ঝরায় লোকে,
                  রতন তাহা, লোকে ভাবে অশ্রু তাকে ভুলের ঝোকে ।”
মানব হৃদয় এমন এক রহস্যময় জগত, যে জগতের পরিধি মাপার কোন যন্ত্র আবিষ্কার হয়নি আজো । আর কান্না যেহেতু সেই হৃদয়েরই একটি প্রকাশ্য কোমল রূপ, তাই কান্নাকে সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা বা এর সঠিক শ্রেণীবিন্যাস করা দুঃসাধ্য ব্যাপার । তবে কান্নার কারণসমূহ এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনচরিত থেকে, তাঁদের মুখনিঃসৃত বাণী থেকে এটুকু বুঝা যায় যে, কান্নার দুটো উৎস রয়েছেঃ
                এক. আত্মকেন্দ্রিক আবেগ, দুই. পরকেন্দ্রিক আবেগ ।

আত্মকেন্দ্রিক আবেগ জনিত কান্নাঃ
আত্মকেন্দ্রিক আবেগ জনিত যে কান্না তাকেও আবার দুভাগে ভাগ করা যেতে পারে । যেমনঃ (ক) অর্থ সম্পদ বা বৈষয়িক কোন বস্তুর ক্ষয়ক্ষতিতে কান্নায় ভেঙে পড়া, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কান্না - যখন অহমবোধ চরমভাবে পীরিত হয়, কোন সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির ব্যর্থতায় হতাশাজনিত কান্না ইত্যাদি । এধরণের কান্না হীন মনোবৃত্তিপ্রসূত ।
(খ) অতি আপনজন দ্বারা মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যে কান্না, বিরহ-ব্যথায় (না পাওয়ার বেদনায়) কান্না ইত্যাদি । এধরণের কান্না সাধারণ মনোবৃত্তিপ্রসূত ।

পরকেন্দ্রিক আবগজনিত কান্নাঃ
পরকেন্দ্রিক আবেগজনিত কান্নাকেও আবার দুভাগে ভাগ করা যায় । যেমনঃ 

(ক) আপনজনের বিপদে-আপদে, রোগে-শোকে বা মৃত্যুতে নীরব অশ্রুমোচন, বিবেকের দংশনে কান্না, পাপবোধ বা প্রায়শ্চিত্ত থেকে যে কান্নার উদ্রেক হয় (যদিও একে আত্মকেন্দ্রিক কান্না বলে মনে হয়, কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, এ কান্না নিছক শাস্তির ভয়ে নয়, বরং মহাপ্রেমময় স্রষ্টার নির্দেশ লঙ্ঘনের ফলে অনুতপ্ত হৃদয় হতে নিঃসৃত হয়ে থাকে । এস্তরের কান্না উচ্চমনোবৃত্তিপ্রসূত ।

(খ) পরের বিপদে-আপদে, রোগে-শোকে, দুঃখ-কষ্টে বা মৃত্যুতে বিগলিত প্রাণের উষ্ণ আবেগবিজড়িত যে অশ্রুবিন্দু সবার অলক্ষে ঝরে পড়ে ; প্রেমাস্পদের কাছ থেকে শত আঘাতপ্রাপ্ত হয়েও, তাঁর কাছে ঘৃণার পাত্র হয়েও এবং তাঁকে পাবেনা জেনেও তাঁর স্মরণে রহস্যময় যে বাষ্পমোচন । এধরণের কান্না আবার নৈর্ব্যক্তিক আবেগের স্তরেও উন্নীত হতে পারে । যেমন সূফী সাধকের খোদাপ্রেমে নিমজ্জিত অবস্থায় এস্তরের কান্না পরিলক্ষিত হয় । এস্তরের কান্না অসাধারণ মনোবৃত্তিপ্রসূত এবং এটাই সার্থক কান্না । নবী-রাসূল এবং অলি-দরবেশগণের জীবনচরিত পাঠ করলে দেখা যায়, তাঁরা প্রায় সকলেই নীরবে অশ্রুমোচন করেছেন মহাপ্রেমময় স্রষ্টার প্রেমে বিগলিত হয়ে ।
আদিমানব হযরত আদম (আঃ) একটি মাত্র ভুলের জন্য তিনশত বছর কান্নাকাটি করেছিলেন, যার ফলে আল্লাহ্পাকের সন্তেুাষ্টি পূণঃঅর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন । অথচ ইবলিসও একটি মাত্র অপরাধ করেই ধিকৃত ও বিতাড়িত শয়তান হয়ে চিরকালের জন্য আল্লাহপাকের রোষানলে পতিত হয় । কারণ একটিই - ইবলিস তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহ্পাকের কাছে ক্ষমা চায়নি, কান্নাকাটিও করেনি ; বরং অহঙ্কারবশতঃ স্বীয় মনগড়া যুক্তিতেই অটল ছিল ।
যবুর কিতাবপ্রাপ্ত নবী হযরত দাউদ (আঃ) দেখার অযোগ্য কিছু দেখেছিলেন বলে তিনশত বছর আল্লাহ্পাকের স্মরণে কান্নাকাটি করেছিলেন । আল্লাহ্পাক তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “হে দাউদ, তুমি কেন এত কাঁদছো ?” উত্তরে হযরত দাউদ (আঃ) বললে, “হে প্রভূ, তোমার কাছে কি আরজ করব ? আমার চোখই আমাকে এই বিপদে ফেলেছে । কান্নার কারণ চোখকেই জিজ্ঞাসা করা উচিৎ যে কেন সে দেখার অযোগ্য ছিু দেখল ?”
হযরত শীশ (আঃ) কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন । লোকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কেন এত কান্নাকাটি করেন ?” তিনি বললেন, “দুটি কারণে । প্রথমতঃ অযোগ্য কিছু দেখার জন্য । দ্বিতীয়তঃ যে চোখ বন্ধুর দর্শন পেয়েছে, আফসোস ! তারপরও সে অন্য কিছু দেখছে । তাই অন্ধ হয়ে যাওয়াই ভাল যেন হাশরের দিন চোখ খুলেই বন্ধুর দর্শনলাভে ধন্য হই ।”
হযরত শোয়ায়েব (আঃ) এত বেশী কাঁদতেন যে তাঁর চোখ দুটি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং দীর্ঘ বারটি বছর অন্ধ অবস্থায় থাকার পর তিনি পরলোকগমন করেন ।
হযরত ইয়াহ্ইয়া (আঃ) শৈশবাবস্থাতেই এত কান্নাকাটি করতেন যে তাঁর চোখের পানিতে গালের মাংস ঘাঁ হয়ে খসে পড়েছিল, ফলে তাঁর সবকটি দাঁতই দেখা যেত । একদিন তিনি এক পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে সেজদারত অবস্থায় আল্লাহ্পাকের স্বরণে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলেন । এমন সময় তাঁর মা সেখানে পৌঁছুলেন । ছেলের অবস্থা দেখে মা স্নেহভরে মাথায় হাত বুলাতে থাকেন । হযরত ইয়াহ্ ইয়া মনে করলেন মালাকুল মউত এসেছেন । তিনি বললেন,“একটু সময় দাও, আমি আমার মা’র সাথে দেখা করে আসি ।” মা একথা শুনে চিৎকার করে বললেন,“ওরে মায়ের প্রাণ ! আমি মালাকুল মউত নই - তোমার মা । উঠ ঘরে চল । তোমার জন্য খাবার তৈরী করে রেখেছি ।” তিনি মায়ের আদেশমত ঘরে ফিরে আসেন । মা তাঁকে বললেন, “বাবা ! এখনো তুমি ছোট । এখনো তোমার দ্বারা কোন পাপকাজ সংঘটিত হয়নি, তবে কেন এত কান্নাকাটি করছ ?” তিনি বললেন,“মা, আপনি ঠিকই বলেছেন । কিন্তু কিয়ামতের দিন যখন দোজখের উত্তপ্ত আগুন আমাকে ঘিরে ধরবে, তখন আপনি শুধু চেয়ে দেখবেন, আমার কোন উপকার করতে পারবেন না ।” মা বললেন,“বৎস ! তোমার একথাও ঠিক ।” তিনি আরজ করলেন,“মা, আপনি আমাকে একাজ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন না । আজ কিছু করতে পারলেই পরকালে নিরাপদ থাকতে পারব ।” হযরত ইয়াহ্‌ইয়া (আঃ) সম্পর্কে আল্লাহ্পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন - “আমি তাঁকে কিশোর বয়সে নেতৃত্ব (নবুয়ত) দান করলাম ! এবং আমার দরবার হতে উৎসাহ দান করলাম এবং পবিত্রতা দান করলাম । এবং সেও খুব পরহিজগার ছিল । সে মা-বাবার অনুগত ছিল । হঠকারী ছিল না । তাঁর উপরে শান্তি বর্ষিত হোক - যেদিন জন্মাল এবং যেদিন সে মারা গেল এবং যেদিন সে আবার জীবিত হয়ে উঠবে ।” (সূরা মারআমঃ আয়াত-১২১৫)

আম্বিয়া-আউলিয়াগণের হৃদয় আল্লাহ্পাকের স্মরণে এমনভাবে গলে যেত যেমন আগুনের তাপে মোম গলে যায় । তাঁদের অন্তঃকরণ বা ক্বালব সৃষ্টিগতভাবেই এমন ছিল ।
একদিন রাসূলেপাক (সাঃ) তাঁর সাহাবাগণকে লক্ষ্য করে বললেন,“আত্মগোপনকারী পরহিজগারগণ আল্লাহ্ তা’আলার অত্যন্ত প্রিয় বান্দা ।”
সাহাবাগণ আরজ করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সাঃ) ! আমাদের মধ্যে তো সেরূপ কোন ব্যক্তি নাই ।” তিনি উত্তর করলেন,“হাঁ আছে । ইয়ামন প্রদেশে ওয়াইস নামে উটের রাখাল আছে । তোমরা তাঁর আদর্শ অনুসরন কর, তাহলে তোমরাও আল্লাহ্ তা’আলার নৈকট্য ও প্রেমলাভে সমর্থ হবে ।”
তাবেঈনগণের মধ্যে হযরত ওয়াইস ক্বরনী (রাঃ) ছিলেন শ্রেষ্ঠ এবং খোদাপ্রেমিক ও রাসূলেপাক (সাঃ) এর মহব্বতের প্রকৃত দাবীদার । কথিত আছে, সাধারণ লোকেরা যখন হাসত (পার্থিব কোন আনন্দে), তিনি তখন কাঁদতেন ; আর তারা যখন কাঁদত (পার্থিব কোন দুঃখে), তিনি তখন হাসতেন । নবীজি (সাঃ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,“উয়াইসুল ক্বারানিউ খাইরুত্ত্বাবেইনা বিইহ্ সানিউ ওয়া আতকিইন ।” অর্থাৎ. ওয়াইস ক্বরণী নেক আমল খোদাপ্রেমে সমগ্র তাবেঈনগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ । মাঝে মাঝে নবীজি (সাঃ) ইয়ামনের দিকে মূখ ফিরিয়ে বলতেন,“আমি ইয়ামনের দিক হতে রহমতের হাওয়া পাচ্ছি ।”
হযরত আব্দুল্লাহ্ খফীফ (রহঃ) একাদিক্রমে চল্লিশ বছর বিনিদ্র থেকে আল্লাহ্পাকের ভয়ে এত কেঁদেছিলেন যে, চোখের পানি পড়তে পড়তে গালের চামড়া ও গোশত খসে পড়েছিল । তিনি যখন কিয়ামত ও কবরের অবস্থা স্মরণ করতেন, তখন বেতস পাতার মত কাঁপতেন এবং মাটিতে পড়ে পানিবিহীন মাছের মত ছটফট করতেন । সজ্ঞানে ফিরে এলে তিনি কোরআনপাকের একটি আয়াত পাঠ করতেন, যার মর্মার্থ হলো - “একটি দল জান্নাতে যাবে, অন্যটি যাবে দোজখে ।” তারপর তিনি কাঁদতে কাঁদতে বরতেন,“হায় ! না জানি আমি কোন দলের মধ্যে গণ্য হব ।”

হযরত সোহাইল আব্দুল্লাহ্ তশতরী (রহঃ) চল্লিশ বছর যাবৎ আল্লাহ্পাকের ভয়ে কান্নাকাটি করেন । লোকে জিজ্ঞাসা করল,“হযরত ! আমরা সব সময়ই আপনাকে কাঁদতে দেখি, এর কারণ কি ? তিনি উত্তরে বললেন,“বন্ধুগণ, কিয়ামতের ভয়ঙ্করতার কথা স্মরণ করেই আমার কান্না আসে । সেদিন পিতা পুত্রের প্রতি, পুত্র পিতার প্রতি, স্বামী স্ত্রীর প্রতি, স্ত্রী স্বামীর প্রতি ফিরেও তাকাবে না । সেই মহা সঙ্কটের কথা স্বরণ করে কার না কান্না আসে ?”

একবার হযরত মনসুর আম্মার (রহঃ) কোন এক পথ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি ঘর হতে কান্নার আওয়াজ শুনতে পান । ক্রন্দনকারী বলছেন,“হে খোদা ! আমি অনেক পাপ করেছি, কিয়ামতের দিনে আমার কি অবস্থা হবে তা আমি জানি না ।” হযরত মনসুর আম্মার (রহঃ) একথা শুনে সেই ঘরের কাছে যান এবং দরজার ফাঁক দিয়ে এই অর্থযুক্ত আয়াত পাঠ করেন,“মানুষ এবং পাথর দোজখের ইন্ধন হবে । দোজখের জন্য কঠিন হৃদয়িবিশিষ্ট ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয়েছে, যারা কাউকে ছাড়বে না এবং আল্লাহ্পাকের সামান্যতম আদেশও অমান্য করবে না । তাদেরকে যে আদেশ দেয়া হবে, তা যথাবিহিত পালন করবে ।” এই আয়াত পাঠ করার পর তিনি আর কোন শব্দ না পেয়ে সেখান হতে চলে যান । পরদিন তিনি শুনতে পেলেন, সেই গৃহবাসী সে সময়ই দেহত্যাগ করেছেন । অর্থাৎ, হযরত মনসুর আম্মার (রহঃ) এর মুখে কুরআনের সেই আয়াত শুনার পর, এর তীব্রতা সহ্য করতে না পেরেই তিনি দেহত্যাগ করেন ।
এপ্রসঙ্গে কুরআন পাকের একটি আয়াত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য - আমি যদি এই কুরআন শরীফ কোন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম, তাহলে দেখতে পেতেন আল্লাহর ভয়ে পাহাড় চেপ্টা হয়ে যেত । মানুষের জন্য এই উপমা, যেন চিন্তা করে দখতে পারে ।”(সূরা হাশরঃ আয়াত-২১)

মানুষের মধ্যে এমন লোকও রয়েছেন - যারা সগৌরবে বলে বেড়ান,“আমি কখনো কাঁদিনি । যারা কাঁদে ওরা বোকা বা দুর্বল চিত্তের, বুদ্ধিমানেরা কখনো কাঁদে না” ইত্যাদি । তাদের একথা যতটা ভুল, ততটাই সঠিক । অর্থাৎ, তাদের এই উক্তি হীন উদ্দেশ্যপ্রসূত কান্নার বেলায় সঠিক, আবার মহৎ উদ্দেশ্যপ্রসূত কান্নার বেলায় এক মস্ত বড় ভুল । এখন দেখা উচিৎ, যিনি এ ধরণের উক্তি করতে অভ্যস্থ তিনি কতটুকু মহত্তের অধিকারী ?

কান্না যদি এতই ঘৃণিত ও অর্থহীন হত তাহলে নবী-রাসূল ও খোদাপ্রেমিক অলি-দরবেশগণ তা সবার আগে বর্জন করতেন । অথচ তাঁরা করেছেন ঠিক উল্টোটা । তাঁদের জীবনাদর্শ পাঠ করলে দেখা যায় যে, অশেষ ধৈর্য্য ও সহনশক্তির অধিকারী ছিলেন সকলেই । যেমন হযরত জাকারিয়া (আঃ) কে অবিশ্বাসীরা মাথা থেকে পা পর্যন্ত করাত দিয়ে দ্বিখন্ডিত করেছিল, অথচ তিনি ‘উহ্’ শব্দও করেননি, চরম ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শণ করেছিলেন । হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, ইসমাঈল (আঃ) কুরবানী হতে উদ্দত হয়েছিলেন, ইউনুস (আঃ) কে সাগরবক্ষে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, ইউসুফ (আঃ) কে অন্ধকার কুপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল - এঁরা কেউই দুর্বলচিত্তের অধিকারী ছিলেন না, অথচ ক্রন্দনকারী ছিলেন ।
হযরত ইয়াহ্‌ইয়া (আঃ) এর মত কোমল হৃদয়বিশিষ্ট নবীকেও হাত-পা কেটে অবশেষে শিরচ্ছেদ করেছিল অবিশ্বাসীরা, অথচ তিনিও ‘উহ্’ শব্দটুকু করেননি, ধৈর্য অবলম্বন করেছিলেন । এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, দুর্বলচিত্ত ও কোমলহৃদয় সমার্থক নয় ; সাধারনত কোন প্রকার বিপদ-আপদে যারা সহজেই ভেঙ্গে পড়ে তারাই দুর্বলচিত্ত । আর নবী-রাসূল ও অলি-দরবেশগণ কোমলহৃদয়ের অধিকারী হয়েও ছিলেন দৃঢ়চেতা মহাপুরুষ । বিপরীতে দেখা গেছে যারা কঠিন হৃদয়বিশিষ্ট, তারাই বিপদে-আপদে দুর্বলচিত্তের পরিচয় দিয়ে থাকেন । একদিন জনৈক সাহাবা নবীজিকে (সাঃ) প্রশ্ন করলেন,“ইয়া রাসূলাল্লাহ্, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন বস্তু কি ?” উত্তরে নবীজি (সাঃ) বললেন,“মুনাফিকের হৃদয় ।” কাজেই, এরূপ হৃদয় থেকে আমাদের আল্লাহ্পাকের কাছে পানাহ্ চাওয়া উচিৎ নয় কি ?

পবিত্র কোরআনে কঠিন হৃদয় ও আল্লাহ্পাকের স্মরণ থেকে উদাসীন হৃদয় সম্পর্কে বহু আয়াত রয়েছে । তার থেকে কয়েকটি উল্লেখ করা হলোঃ

১। আপনি তাকে অনুসরণ করবেন না । যার অন্তরকে আমার জিকির হতে উদাসীন রেখেছি এবং সে নিজের খুশীমত কাজ করছে । এবং তার কাজও সীমা ছাড়িয়ে গেছে । (সূরা ক্বাহাফঃ ২৮)
২। যখন আল্লাহর কথা উল্লেখ করা হয়, তখন তাদের মন সঙ্কুচিত হয় যারা পরকাল সম্পর্কে বিশ্বাসী নয় এবং যখন তাঁকে বাদ দিয়ে অন্যের আলোচনা করা হয় তখন তারা সঙ্গে সঙ্গেই খুশী হয় । (সূরা যুমারঃ ৪৫)
৩। তারই সেই দল, আল্লাহ্ যাদের অন্তরে, শ্রবনেন্দ্রীয়ে, দর্শনেন্দ্রীয়ে, সীলমোহর করে দিয়েছেন, আসলে তারাই উদাসীন । নিঃসন্দেহে তারাই পরকালে ক্ষতিগ্রস্থ হবে । (সূরা নাহলঃ ১০৮-১০৯)
৪। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন, ইসলামের জন্য তার বুক-মন প্রশস্থ করেন, কিন্তু যাকে বিভ্রান্ত করতে চান, তার বুক সংকুচিত করে দেন, যদিও সে (স্বীয় জ্ঞান-গরিমায় মত্ত হয়ে) আসমানে চড়তে চায় । (সূরা আনয়াম: ১২৬)
৫। যার বুক আল্লাহ্ ইসলামের জন্য খোলে দিয়েছেন, সে পালনকর্তার তরফ হতে আলোর পথে রয়েছে । সুতরাং তারা - যাদের অন্তর আল্লাহর স্বরণে সাড়া দেয় না, ধ্বংস হোক । তারাই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে । (সূরা যুমারঃ ২২)
৬। তারা কি দুনিয়ার বুকে ভ্রমণ করেনি ? তাদের যদি মন থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই তা দিয়ে বুঝতে পারত, যদি কান থাকত তাহলে তা দিয়ে শুনতে পেত । তাদের চোখ অন্ধ হয়নি, বরং বুকের মধ্যে যে মন রয়েছে তাই অন্ধ হয়েছে । (সূরা হাজ্ব: ৪৬)
৭। আপনি মৃতদেরকে (মৃত অন্তঃকরণবিশিষ্ট লোকদেরকে) মোটেই শোনাতে পারবেন না - যখন তারা পিঠ ঘুড়িয়ে ফিরে গেল । আপনি অন্ধদেরকে (অন্তরদৃষ্টিহীনদেরকে) তাদের বিভ্রান্তি সম্পর্কে পথ দেখাতে পারবেন না । তাদেরকে শোনাতে পারবেন, যারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি আস্থাবান, সুতরাং তারাই তাবেদার মুসলমান । (সূরা আন্ নামলঃ ৮০-৮১)
৮। নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাসী, তাদেরকে আপনি সতর্ক করুন আর নাই করুন, কোন অবস্থাতেই তারা ঈমান আনবে না । আল্লাহ্ তাদের অন্তঃকরণ সমূহ ও শ্রবনেন্দ্রীয়ের উপর মোহর মেরে দিয়েছেন । এবং তাদের দৃষ্টিশক্তির উপর রয়েছে আবরণ ; এবং তাদের ভাগ্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি । (সূরা বাক্বারাহ্ঃ ৬-৭)
৯। তাদের অন্তরে কঠিন ব্যাধি রয়েছে, আল্লাহ্ তাদের অন্তর-রোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাদেরকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে, কেননা তারা মিথ্যাচারী ছিল । (সূরা বাক্বারাহ্ঃ ১০)
১০। তারা বধির, বাকশক্তিহীন, ও অন্ধ ; তাই তারা (সরল পথে) প্রত্যাবর্তন করবে না । (সূরা বাক্বারাহ্ঃ ১৮)
১১। (বনি ইসরাইলদের) প্রতিশ্রূতি ভঙ্গের দরূণ আমি তাদেরকে অভিসম্পাত প্রদান করলাম, তাদের হৃদয় শক্ত করে দিলাম ; তারা আয়াতসমূহকে রদবদল করে দিত । (সূরা মায়িদাঃ ১৩)
১২। আমার শাস্তি যখন তাদেরকে আঁকড়ে ধরল, তখন কেন তারা মিনতি জানায়নি ? মূলত তাদের অন্তর শক্ত হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের কর্মকে শয়তান চিত্তাকর্ষক করে দেখাত । (সূরা আনয়ামঃ ৪৩)
১৩। তাদের কাছে রাসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে এসেছিলেন ; কিন্তু তারা এমন ছির না যে, একবার যা মিথ্যা জেনেছে তাতে আবার ঈমান আনবে ; এভাবে আল্লাহ্ কাফেরদের মনগুলোর উপর সীলমোহর করে দেন । (সূরা আরাফঃ ১০১)
১৪। যেন এভাবে তাদের পরীক্ষা করা যায় - যাদের মনে ব্যাধি রয়েছে । এবং যাদের মন কঠিন হয়ে গেছে, শয়তান যাকিছু মিশিয়ে দিল তাই দিয়ে । নিশ্চয়ই গোনাহ্গার জালিমরা শয়তানের পথে অনেকদূর সরে পড়ল । (সূরা হাজ্বঃ ৫৩)
১৫। তিনিই সেই মহান সত্তা - যিনি তোমাদের জন্য কান, চোখ এবং মন তৈরী করেছেন ; কিন্তু তোমরা খুব কমই শোকর কর । (সূরা মু’মিনঃ ৭৮)
১৬। যখন তাকে আমার আয়াত পড়ে শুনানো হয়, তখন বলে - এসব সাবেক কালের কাহিনী ! দেখুন তারা যা করছে এবং তাদের অন্তরে তার ফলে মরচে পড়েছে । (সূরা মু’তাফীকঃ ১৩-১৪)
১৭। যারা ঈমানদার তাদের জন্য কি সেই সময় এখনো আসেনি - যখন মন আল্লাহর স্বরণ এবং সঠিক জীবন ব্যবস্থা যেটুকু নাজিল করা হয়েছে, তাতে নুয়ে আসবে । যেন তাদের ন্যায় ওরাও হয়ে যায় - এর আগে যারা কিতাব পেয়েছিল, তারপর অনেকদিন কেটে গেল এবং তাদের অন্তর কঠিন হয়ে পড়ল, আসলে তাদের বেশীর ভাগই ছিল অবাধ্য । (সূরা হাদিদঃ আয়াত-১৬)
১৮। তোমরা কি এই কালাম নিয়ে অবাক হচ্ছো ? এবং তোমরা হাঁসছ এবং তোমরা মোটেই কাঁদছ না ? এবং তোমরা বড়াই করছ ? তোমরা আল্লাহর দরবারে সাজদা কর, এবং তাঁর ইবাদত কর (সাজদা-১২)। (সূরা নাজমঃ ৫৯-৬২)
১৯। আমি তাদেরকে আজাবের মাধ্যমে পাকড়াও করেছিলাম, কিন্তু তারা তখন সকাতরে ফরিয়াদ করেনি এবং ফুঁপিয়ে কেঁদেও ওঠেনি । (সূরা মু’মিনঃ ৭৬)
২০। প্রত্যেক বিদ্রূপকারী ও চোগলখোর ধ্বংস হোক । যে টাকা-পয়সা জমা করে এবং তা গুণে ঠিক রাখে । এবং সে মনে মনে ভাবে টাকা-পয়সা তাকে চিরস্থায়ী করবে। না, তা কখনো সম্ভব নয় - তাকে হুতামায় নিক্ষেপ করা হবে । আর আপনি জানেন ? হুতামা কি জিনিস ? আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত আগুন । যা অন্তরসমূহকে জড়িয়ে ধরবে । এবং তাতে আটক হবে । উঁচু উঁচু খাম্বার মত আগুনের শিখাগুলোর মধ্যে । (সূরা হুমাজাঃ ১-৮)

এসকল আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ব্যাধিগ্রস্থ, অনমনীয়, পাথর হৃদয় বিশিষ্ট মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে । এ ধরনের মানুষ স্বীয় জ্ঞান-গরিমা ও সংকীর্ণ স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকে এবং নিজের বুদ্ধির পরিসীমায় একবার যা সঠিক বলে মনে করে, তা যদি প্রকৃতপক্ষে সঠিক নাও হয়, তথাপি সে পাথরের মতই অটল, অনড় থাকে । তারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী কোন কিছুর বিচার-বিশ্লেষণ না করে নিজেদের খেয়াল-খুশী মতই যা মনে আসে তাই সঠিক বলে বিতর্ক শুরু করে । আল্লাহর নির্দেশের পরিবর্তে স্বীয় খেয়াল-খুশীকে অনুসরন করে যারা, তারা নিজেদের অজান্তেই শির্ক করে যাচ্ছে । এদের সম্পর্কে আল্লাহ্পাক ইরশাদ করেছেনঃ

১। আপনি সেই লোকটির অবস্থা দেখেননি - যে নিজের খেয়াল-খুশীকে উপাস্য মেনে নিয়েছে এবং আল্লাহ্ তার বোধ থাকা সত্ত্বেও বিভ্রান্ত করেছেন এবং তার কান, মন সীলমোহর করেছেন । এবং তার চোখের উপর পর্দা রেখেছেন, সুতরাং এমন লোককে আল্লাহ্ ছাড়া আর কে সুপথ দেখাতে পারবে ? তোমরা কি বুঝবে না ? (সূরা জাসিয়াঃ ২৩)
২। যে তার পালনকর্তার পথে এগিয়ে যাচ্ছে সে কি তার সমান ? যার কাছে স্বীয় অপকর্ম সুন্দর বলে মনে হয় এবং যারা নিজেদের খুশীমত কাজ করে । (সূরা মুহাম্মদঃ ১৪)
৩। আপনি তাকে অনুসরন করবেন না, যার অন্তরকে আমার জিকির হতে উদাসীন রেখেছি । এবং সে নিজের খুশীমত কাজ করছে । এবং তার কাজও সীমা ছাড়িয়ে গেছে । (সূরা ক্বাহাফঃ ২৮)
৪। এবং মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছে, যে আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে অংশীদার মনে করে, আল্লাহকে যেমন ভালবাসে সেগুলোকেও তেমনি ভালবাসে ; এবং ঈমানদারগণের খোদাপ্রেম অত্যন্ত সুদৃঢ় এবং কতনা ভাল হত যদি সীমালঙ্ঘনকারী চরম শাস্তি অবলোকন করে একথা অনুধাবন করত যে, সর্বশক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চিয়ই তিনি কঠোর শাস্তিদাতা । (সূরা বাক্বারাহ্ঃ ১৬৫)
৫। আল্লাহ্ কোন লোকের বুকে দুটো হৃৎপিন্ড তৈরী করেননি (অর্থাৎ তা যদি হত, তাহলে একটি দিয়ে আল্লাহকে ভালবাসত অপরটি দিয়ে যাকে শরীক করে তাকে)। (সূরা আহযাবঃ ৪)

উপরের আয়াতগুলোতে তাদের কথা বলা হয়েছে, যারা একই সাথে খোদাপ্রেমের দাবী করে এবং পার্থিব বস্তুনিচয়কেও তদ্রূপ ভালবাসে । অনেকে কোন পার্থিব বস্তুর ক্ষয়ক্ষতিতে কান্না ও আহাজারি জুড়িয়ে দেয়, অথচ মহাপ্রেমময় স্রষ্টার স্বরণে কোনদিন নিভৃতে একফোটা চোখের পানিও ফেলেনি । এদের এই কান্না হীন মনোবৃত্তিপ্রসূত । এ কান্না তার জন্য কোন কালেই মঙ্গল বয়ে আনবে না । অপরদিকে যারা প্রকৃত সত্যনিষ্ঠ ও খোদাপ্রেমিক তারা আল্লাহর স্বরণ ব্যতীত পার্থিব বা বৈষয়িক কোন ব্যাপারে অশ্রূমোচন করেন না । তাদের ক্বালব বা অন্তকরণ স্বচ্ছ এবং কোমল । এধরণের অন্তকরণকেই (নফসে মুৎমাইন্না) আল্লাহ্পাক তাঁর আরশ বা আসন বলে অভিহিত করেছেন । এধরণের অন্তকরণবিশিষ্ট মহান ব্যক্তিদের সম্পর্কে আল্লাহ্পাকের বাণীঃ

১। নিশ্চয়ই ইব্রাহীম ছিলেন ধৈর্যশীল ; নরমদিল ও ফরিয়াদকারী । (সূরা হুদঃ ৭৫)
২। এছাড়া আমি তাঁদের পর অনেক রাসূল পাঠিয়েছি, এবং তাঁকে (হযরত ঈসা আঃ) ইঞ্জিল দান করেছি । যারা তাঁকে মেনে চলত আমি তাঁদের অন্তরকে নম্র ও দয়ার্দ্র করেছি । (সূরা হাদীদঃ ২৭)
৩। বলে দিন, তোমরা তাতে ঈমান আনো কিংবা না-ই আনো । যাদেরকে এর আগে ইলম দান করা হয়েছিল, তাদেরকে যখন পড়ে শুনান হয়, তখন তারা চিবুকের উপর ভর করে সাজদায় পড়ে যায় । আর অঝোরে কাঁদতে থাকে । এভাবে তাদের মনে আরও বিনয়ভাব পয়দা হয় । (সূরা বণী ইসরাইলঃ ১০৭-১০৯)
৪। যে মনোযোগের সাথে শুনছে এবং যার সজীব অন্তর রয়েছে, তার জন্য এতে উপদেশ রয়েছে । সূরা ক্বাফঃ ৩৭)
৫। বলুন, সত্যই আল্লাহ্ যাকে চান বিভ্রান্ত করেন এবং যে কেউ তাঁর দিকে নিবিষ্ট হয়, তাকেই তিনি নিজের দিকে পথ দেখান । যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি পায় শোন ! আল্লাহর জিকির করলে মন শান্ত হয়, স্বস্তি পায় । (সূরা রা’আদঃ ২৭-২৮)
৬। তোমরা নিজেদের পালনকর্তাকে বিনয়ের সাথে ও চুপিসারে ডাকো ; নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না । তোমরা সংশোধনের পরে দুনিয়ার বুকে ফিৎনা-ফাসাদ সৃষ্টি কর না - তাঁকে ভয় ও আশা নিয়ে ডাকতে থাকো ; নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত পূণ্যবানদের কাছেই রয়েছে । (সূরা আ’রাফঃ ৫৫-৫৬)
৭। আল্লাহ্ কিতাব আকারে বড় উত্তম বাণী অবতীর্ণ করেছেন, যাতে পরস্পর মিল আছে । এবং বার বার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে, তাদেরও শরীর কেঁপে উঠে যারা স্বীয় পালনকর্তাকে সমীহ করে, তাদের দেহমন আল্লাহর জিকিরের দিকে আকৃষ্ট হয়, ইহা আল্লাহর হিদায়াত যাকে খুশী এর মারফতে হিদায়াত করেন, মূলত আল্লাহ্ যাকে বিভ্রান্ত করেন তার জন্য কোন মুর্শিদ পাবেন না । (সূরা যুমারঃ ২৩)
৮। রাসূলের নিকট অবতীর্ণ জিনিস যখন তারা শ্রবণ করে, তখন দেখতে পাবে যে, তাদের চোখ অশ্রূ সির্জন করছে ; কেননা তারা সত্যকে জানতে পেরেছে এবং তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা ! আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি ; আমাদেরকে তোমার অনুগতদের অন্তর্ভুক্ত করে নাও । (সূরা মায়িদাঃ ৮৩)
৯। যাদেরকে আমি পছন্দ করেছি - যখন তাদেরকে রাহমানের আয়াতসমূহ পড়ে শোনানো হয়, তখন তারা কাঁদতে কাঁদতে সাজদায় পড়ে যায় । (সূরা মারয়ামঃ ৫৮)
১০। (বৃদ্ধ ও অক্ষম ব্যক্তিরা) যখন (তাদেরকে জেহাদে পাঠানোর জন্য) আপনার কাছে এলো, যেন আপনি তাদের জন্য সওয়ারীর ব্যবস্থা করেন, আপনি বললেন, আমার কাছে সওয়ারীর কোন ব্যবস্থা নেই, যাতে করে তোমাদেরকে পাঠাতে পারি । এমতাবস্থায় তারা যখন ফিরে যায়, তখন শোকে চোখ থেকে পানি ঝরতে থাকে, কারণ তারা খরচ করতে পারবে এমন কিছুই পায়নি । (সূরা তাওবাঃ ৯২)
১১। আপনি আমার বান্দা ইব্রাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের কথা স্বরণ করুন । তারা দুহাত ও দুচোখ বিশিষ্ট ছিলেন । আমি তাদেরকে একটি কাজে বিশেষভাবে নিযুক্ত - তা হচ্ছে পরকালের কথা স্বরণ করা । এবং তারা আমার কাছে সুনির্বাচিত ও বিনয়ীদের মধ্যে উত্তম । (সূরা সোয়াদঃ ৪৫-৫৭)
১২। যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কিছুই উপকার দেবেনা ! তবে তার কথা আলাদা যে আল্লাহর দরবারে পরিশুদ্ধ ক্বালব (অন্তর) নিয়ে হাজির হবে । (সূরা শোয়ারাঃ ৮৮-৮৯)

উপরোক্ত আয়াতগুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষেণের অপেক্ষা রাখে না । এসকল আয়াত ধৈর্য্যশীল, বিনয়ী, আল্লাহ্পাকের প্রতি নিবিষ্টচিত্ত মহামানবগণের উদ্দেশ্যে এবং সাধারণ মানুষের জন্য পথ নির্দেশরূপে নাযিল হয়েছে । মূলতঃ আল্লাহ্পাকের প্রতি যারা নিবিষ্ট হন, আল্লাহ্পাকও তাদের প্রতি নিবিষ্ট হন । যেমন একটি আয়াতে আল্লাহ্পাক ইরশাদ করেন,“অতএব, তোমরা আমকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদিগকে স্মরণ করব ।” নবী-রাসূলগণ ছিলেন আল্লাহ্পাকের সর্বাধিক স্মরণকারী, তারপর সাহাবয়ে কিরামগণ, তাবেঈনগণ, তাবে-তাবেঈনগণ, আওলিয়ায়ে কিরামগণ । আর যারা আল্লাহ্পাকের স্মরণকারী ও তাঁর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ মহামানব তাঁরা একইসঙ্গে ক্রন্দনকারীও বটে ।

কান্না সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ব্যতীত অমুসলিম মনীষীদের কয়েকটি বাণীর উল্লেখ করা হলোঃ

# কান্নায় অনন্ত সুখ আছে, তাইতো আমি কাঁদতে এত ভালবাসি । - কীটস
# ভালবাসা আচ্ছাদন নয়, বরং চোখের জল । - ইমারসন
# কান্না চোখের একটা মহৎ ভাষা । - রবার্ট হেরিক
# দুঃখের একমাত্র মৌন ভাষাই হলো কান্না । - ভল্টেয়ার

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মুসলিম হোন আর অমুসলিমই হোন, প্রত্যেক মহৎ ব্যক্তিবর্গের কাছে কান্না এক গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত আচরণ । মহত্তের জন্যই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, নয়তো ইতর প্রাণীর সাথে তার পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াত । ভাবাবেগ ও কান্না অনেক সময় ইতর প্রাণীদের মাঝেও পরিলক্ষিত হয় । গৃহপালিত পশু মনিবের বিপদে নিজের প্রাণ তুচ্ছজ্ঞান করে তাঁকে বিপদ হতে উদ্ধার করেছে, এমনকি নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছে - এমন ঘটনা অনেকেই হয়তো শুনে থাকবেন । এখানেও মনের কোমল অনুভুতি কাজ করে, যা সেই প্রাণীটিকে মহৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করেছে । আবার অনেক সময় মনিবের মৃত্যুতে পালিত জন্তুটির দুচোখ বেয়ে নেমে আসে অশ্রূধারা ; তার নিরব চাউনি ও ব্যথাতুর হৃদয়ের যে অভিব্যক্তি ফোটে উঠে, অনেক সময় তা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মাঝেও দেখতে পাওয়া যায় না ।

অষ্টাদশ সহস্র সৃষ্টির সেরা মানুষ হয়ে যদি কেউ কখনো ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে একবিন্দু অশ্রূ বিসর্জন না দিয়ে থাকেন, তিনি চিত্তজয়ী মহাত্মা কি-না আমার জানা নেই । তবে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বঙ্কিম চন্দ্র চট্রপাধ্যায়ের বাণীটি এক্ষেত্রে প্রযোয্য হতে পারেঃ

“যে কখনো রোদন করে নাই, সে মনুষ্য মধ্যে অধম । তাহাকে কখনো বিশ্বাস করিও না । নিশ্চিত জানিও সে পৃথিবীর সুখ কখনো ভোগ করে নাই । পরের সুখ কখনো তার সহ্য হয়না । এমন হইতে পারে যে কোন আত্মচিত্ত বিজয়ী মহাত্মা । বিনা অশ্রূমোচনে গুরুতর মনঃপীড়া সহ্য করিতেছেন এবং করিয়া থাকেন । কিন্তু তিনি যদি কষ্মিনকালে, একদিন বিরলে একবিন্দু অশ্রূজলে পৃথিবী সিক্ত না করিয়া থাকেন, তবে তিনি চিত্তজয়ী মহাত্মা হইলে হইতে পারেন, কিন্তু আমি বরং চোরের সাথে প্রণয় করিব তথাপি তাহার সঙ্গে নহে !”  



 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন