রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৬




ইলম ও আলেম :

ইলম আরবী শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ জ্ঞান। যিনি ইলম হাসেল বা অর্জন করেছেন, তিনিই আলেম। ইসলামিক পরিভাষায় প্রকৃত আলেম সেই ব্যক্তি যার মধ্যে প্রকৃত ইলম রয়েছে।
বাস্তব জগতে আমরা যে ধরণের জ্ঞান আহোরণ করে থাকি যেমন : ভাষা, বিজ্ঞান (পদার্থ, রসায়ন, জীব, সমাজ), গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশল শাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, দর্শণ শাস্ত্র ও আরও যত রকমের বাহ্যিক জ্ঞানের পরিধি আছে – এই সব জ্ঞানও ইলমের অন্তর্ভূক্ত, তবে ইসলামিক পরিভাষায় বা কোরআন ও হাদিসে যে অর্থে ইলম বা আলেম শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা একটু ভিন্ন অর্থে।

সৃষ্টজগতে সবচেয়ে বেশী ইলমের অধিকারী কে বা সবচেয়ে বড় আলেম কে ? এই প্রশ্ন করলে সবাই একবাক্যে বলবেন, বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সাঃ)। একথা ১০০% সঠিক এবং এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু, আমরা এটাও জানি যে, নবীজী (সাঃ) কোন প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা বা শিক্ষালাভ করেন নি। উনার জ্ঞান ঐশী জ্ঞান, যা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে। যা আর কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

তবে, একথাও অনস্বীকার্য যে জ্ঞান নবীজী হাসিল করেননি, সে জ্ঞান হাসেল করার জন্য প্রয়োজনে চীন দেশে যেতে নির্দেশ দিতেন না। এটা নবীজীর স্বভাব বিরুদ্ধ ছিল। এক বালককে তিনি মিষ্টিখেতে নিষেধ করার জন্য নিজে তিন দিন মিষ্টি খাওয়া বন্ধ করে পরে নিষেধ করেছেন। অতএব, নবীজীর মধ্যে যে, ঐশী জ্ঞান আছে, সেই ঐশী জ্ঞান অর্জনের জন্যই তিনি নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সেই জ্ঞানেরই আহ্বান জানানো হয়েছে।

মানুষের দেহের মধ্যে যেমন দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান দুই ধরণের পরস্পর বিরোধীশক্তির সমাহার ৪ টি জড় পদার্থ রয়েছে, যেমন : মাটি, পানি, আগুন ও বাতাস (প্রতিটি কোষের প্রটোপ্লাজম – পানি মাটি দ্বারা তৈরী, আগুন – ইলেক্ট্রন, কোষ গহ্বর – বায়ু)। এখনে আগুন মাটিকে শক্ত করে ফেলে, আবার বাতাস আগুনকে আরো জ্বলতে সাহায্য করে, আর পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। এই পরস্পর বিরোধী শক্তির সমন্বয়ে অভূতপূর্ব সৃষ্টি এই মানুষ। এছাড়াও মানুষকে আল্লাহ্ পাক নিজের থেকে ১০ টি সূক্ষ্ণ জগতের শক্তি যথা – ১। ইলম, ২। হায়াত, ৩। সৃজনশক্তি, ৪। শ্রবণশক্তি, ৫। দর্শণশক্তি, ৬। অনুভুতি, ৭। বাকশক্তি, ৮। চিন্তাশক্তি, ৯। স্পর্শশক্তি ও ১০। ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন, যা অন্য কোন সৃষ্টিকে দেননি। এই কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু, আল্লাহ প্রদত্ত এই ১০ টি আমনতের খেয়ানত না করে আমরা যদি এই শক্তিগুলোর সঠিক ও ন্যায়পথের প্রয়োগ করতে পারি, তখনই আমরা সৃষ্টির সেরা মানুষ বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হব। শুধুমাত্র এই ১০ টি গুণ বা শক্তির সমাহার থাকলে আমরা কখনো পাপকাজ করতাম না। কিন্তু, আল্লাহপাক আমাদের মধ্যে এছাড়াও আরও ৬টি উপাদান আমাদের ভিতরে প্রবেশ করিয়েছেন যা নফস ও শযতানের হাতিয়াররূপে কাজ করে, যথা – কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাতসৌরয। এগুলোকে আমরা যদি লাগাম দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি, তখনই আল্লাহ প্রদত্ত ১০ টি শক্তিই সক্রিয় হবে। তখনই একজন মানুষ ইনসানে-কামেল বেলে গণ্য হন।

নিজ সম্পর্কে, সৃষ্টি সম্পর্কে এবং স্রষ্টা সম্পর্কে যে জ্ঞান কোরআন ও হাদিসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে, সেই জ্ঞান অর্জন করাই ফরয বলা হয়েছে। শুধু নামায, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাতের জ্ঞান থাকলেই হলো, এটা কিন্তু ঠিক নয়। এটাই যদি হতো, তাহলে আল্লাহপাকের অগণিত ফেরেস্তারাই যথেষ্ট ছিল শুধুমাত্র বাহ্যিক ইবাদতের জন্য। মানুষ সৃষ্টির প্রয়োজন হতোনা। আল্লাহ পাক নিজেকে এবং তাঁর সৃষ্টি রহস্য অবগত করানোর জন্যই মানব সম্প্রদায়কে সৃষ্টি করেছেন।

মানুষ যেমন জড়জগতের ও সূক্ষ্ণজগতের – দুই ধরণের উপাদান দ্বারা তৈরী। ঠিক তেমনই জাহেরী (প্রকাশ্য) ও বাতেনী (অপ্রকাশ্য) – দুই ধরণের জ্ঞান রয়েছে। যেহেতু, বিশ্বনবী এই দুই ধরণের জ্ঞানেরই অধিকারী ছিলেন ; তাই, তাঁকে অনুসরণ করতে গেলে এই দুই ধরণের জ্ঞানই আহোরণ করতে হবে। যারা এই দুই ধরণের জ্ঞানের অধিকারী, তাঁরাই প্রকৃত বা পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করেছেন। এবং এরাই হলেন প্রকৃত আলেম। এরাই হলেন, আল্লাহ পাকের ভাষ্যমতে পাক কোরআনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী । অতএব, এঁদের সাথে শত্রুতা করা স্বয়ং আল্লাহপাকের সাথে শত্রুতা করার শামিল।

যেহেতু, হাদিসে কুদসীতে উল্লেখ রয়েছে, “যে ব্যক্তি আমার কোন অলির সঙ্গে দুশমনি করল, সে যেন স্বয়ং আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল।”

অতএব, আল্লহপাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করতে চাইলে আল্লাহর অলিদের সাথে দুশমনি করুন, আমার কোন আপত্তি নেই।

বরং, আল্লাহপাক ফরমান, “তোমরা আমাকে অন্বেষন করো এবং আমার সম্পর্কে যে জ্ঞাত আছে তাঁহার নিকট গমন করো” এখন, পাঠক ভাইয়েরা আপনারাই উপলব্ধি করে দেখেন যে, কোন ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞাত আছে, তার কাছে যাওয়ার জন্য আল্লাহপাকের এই আহ্বান ফরয, সুন্নত, নফল না মুস্তাহাব – একটু ভেবে দেখূন !

১। অনেক লোকই দিনে অন্তত পাঁচবার মুখ ধোয়, কিন্তু পাঁচ বছরেও একবার অন্তর ধোয়ার কথা চিন্তা করে না। - হযরত ইব্রাহীম এবনে আদহাম (রহঃ)
২। ক্রোধ মনুষ্যত্বের আলোকশিখা নির্বাপিত করিয়া দেয়। - হযরত ইমাম গাজ্জালী (রহঃ)
৩। যতদিন লেখাপড়ার অভ্যাস থাকে ততদিনই মানুষ আলেম থাকে। আর যখনই ধারণা জন্মিয়া যায় যে, আমি আলেম হইয়া গিয়াছি তখনই মুর্খতা তাহাকে ঘিরিয়া ধরে। - আল্ ফারাবী
৪। সততা ও ন্যায় পরায়নতা আল্লাহর রাহে কুরবানী করার চাইতেও অনেক বেশী পূণ্যের কাজ। - হযরত সোলায়মান (আঃ)
৫। শক্তির দ্বারা যে আনুগত্য লাভ হয় তা ক্ষণস্থায়ী, আর ভালবাসার মাধ্যমে যে আনুগত্য লাভ হয় তা চিরস্থায়ী। - ইবনে জরীর।
* যে পরিশুদ্ধ হয়না , তার  সালাত হয়না। - মিশকাত শরীফ
* যে ব্যক্তি লোক  দেখানোর জন্যে সালাত  পড়লো , সে শিরক করলো ।  [ আহমদ ] 
* কোনো বান্দাহ  ততোক্ষণ পর্যন্ত মুসলিম হয়না ,  যতোক্ষণ তার মন ও যবান  মুসলিম না হয়। [ তাগরীব ] 
* পবিত্রতা ঈমানের  অর্ধেক। [ সহীহ মুসলিম।
* আমার পরে সবচেয়ে বড়  দানশীল সে , যে কোনো  বিষয়ে জ্ঞান লাভ করলো ,  অতপর তা ছড়িয়ে দিলো ।  [ বায়হাকী ]
* আল্লাহ যার ভালো চান,  তাকে দীনের সঠিক জ্ঞান  দান করেন। [ সহীহ বুখারী ] 

রসূলুল্লাহর  (সাঃ) কতিপয়  দু’আঃ
১। হে আল্লাহ ! আমি  তোমার কাছে পানাহ চাই  দুশ্চিন্তা থেকে , মনোকষ্ট  থেকে , বার্ধক্য থেকে ,  আলস্য ও কাপুরুষতা থেকে  এবং কৃপণতা ও ঋণের বোঝা  থেকে । [ সহীহ বুখারী ] 
২। হে আল্লাহ ! আমার  অন্তরে আল্লাহভীতি দাও  এবং তাকে পরিশুদ্ধ করো।  তুমিই তো তার উত্তম  পরিশুদ্ধকারী । [ সহীহ  মুসলিম ] 
৩। ওগো আল্লাহ ! আমি  তোমার কাছে এমন জ্ঞান  থেকে পানাহ চাই যাতে  কোনো কল্যাণ নেই । আর  এমন হৃদয় থেকেও আশ্রয় চাই  যাতে তোমার ভয় নেই।  [ আহমদ ] 
৪। আয় আল্লাহ ! আমি  তোমার কাছে পানাহ চাই  সংশয় থেকে , কপটতা  থেকে আর অসৎ চরিত্র  থেকে। [ নাসায়ী]
৫।  হে আল্লাহ ! আমি  তোমার কাছে চাই হিদায়াত  , আল্লাহভীতি , পবিত্র  জীবন এবং প্রাচুর্য । [ সহীহ  মুসলিম ] 
 ৬। ওগো আল্লাহ ! আমাকে  ক্ষমা করে দাও , আমার প্রতি  দয়া করো , আমাকে সঠিক পথ  দেখাও , আমাকে স্বস্তি দান  করো এবং আমাকে জীবিকা  দাও। [ সহীহ মুসলিম ] 
 ৭। আমার আল্লাহ ! আমি  তোমার কাছে কল্যাণময়  জ্ঞান , গ্রহণযোগ্য আমল আর  পবিত্র জীবিকা । [ আহমদ] 
৮। ওগো আল্লাহ ! আমি  তোমার কাছে প্রার্থনা  করছি সুস্থতা , স্বস্তি ,  বিশ্বস্ততা , উত্তম চরিত্র আর  তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্টি।  [ বায়হাকী ] 
৯।  আমার আল্লাহ ! আমি  তোমার ভালোবাসা চাই ,  আর যে তোমাকে  ভালোবাসে তার  ভালোবাসা চাই।  [তিরমিযী]  
১০। আবু যর (রা) বলেন : আমি  নিবেদন করলাম,ওগো আল্লাহ  রসূল আমাকে উপদেশ দিন।  তিনি বললেনঃ আমি  তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি  আল্লাহকে ভয় করবার। কারণ  এটাই তোমার সমস্ত কাজকে  সৌন্দর্য দান করবে।  আমি বললাম , আমাকে আরো  উপদেশ দিন।  তিনি বললেন : কুরআন পাঠ  এবং আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর  বিষয়ে আলোচনাকে  নিজের কর্তব্য কাজ বানিয়ে  নাও। এতে আকাশে তোমায়  নিয়ে আলোচনা হবে আর  এটা পৃথিবীতে তোমার  পথের আলো হবে।  আমি বললাম , আমাকে আরো  উপদেশ দিন।  তিনি বললেন : বেশী সময়  নীরব থাকবে , কম কথা  বলবে। এটা শয়তানকে  তাড়াবার হাতিয়ার হবে এবং  তোমার দীনের কাজের  সহায়ক হবে।  আমি আরয করলাম , আমাকে  আরো আদেশ দিন।  তিনি বললেন তিক্ত হলেও  সত্য কথা বলবে।  আমি নিবেদন করলাম ,  আমাকে আরো উপদেশ দিন।  তিনি বললেন  জিহাদ  (স্বীয় নফসের বিরুদ্ধে) করাকে  নিজের কর্তব্য বানিয়ে নাও।  কারণ এটাই মুসলমানদের  বৈরাগ্য।  আমি বললাম , আমাকে আরো  কিছু বলুন ।  তিনি বললেন : দরিদ্র  লোকদের ভালোবাসবে  এবং তাদের সাথে উঠাবসা  করবে।  আমি বললাম , আমাকে আরো  উপদেশ দিন।  তিনি বললেন : তোমার  নিজের মধ্যে যেসব দোষ  ত্রুটি আছে , সেগুলোর  দিকে তাকাও । অন্যের  মধ্যে যে দোষ ত্রুটি আছে  তা খুজে বেড়ানো এবং  বলে বেড়ানো থেকে  বিরত থাকো।  অতপর তিনি আমার বুকে হাত  মেরে বললেন , আবু যর !  কর্মকৌশল ও কর্মপ্রচেষ্টার  চাইতে বড় বুদ্ধিমত্তা আর  নেই। হারাম ও নিষিদ্ধ কাজ  থেকে বিরত থাকার চেয়ে  বড় বীরত্ব কিছু নেই। আর সুন্দর  ব্যবহারের চাইতে বড়  কোনো ভদ্রতা নেই। [ ইবনে  হিব্বান ] 
১১। আমার প্রভু আমাকে  নয়টি নির্দেশ দিয়েছেন।  সেগুলো হলো :  ১. গোপনে ও প্রকাশ্যে  আল্লাহকে ভয় করতে ,  ২. সন্তুষ্টি এবং অসন্তুষ্টি উভয়  অবস্থাতে ন্যায় কথা বলতে ,  ৩. দারিদ্র ও প্রাচুর্য উভয়  অবস্থাতে মধ্যপন্থা অবলম্বন  করতে ,  ৪. যে আমার সাথে সম্পর্ক  ছিন্ন করে , তার সাথে  সম্পর্ক জুড়তে,  ৫. যে আমাকে বঞ্চিত করে ,  তাকে দান করতে ,  ৬. যে আমার প্রতি অবিচার  করে , তাকে ক্ষমা করে  দিতে ,  ৭. আমার নীরবতা যেনো  চিন্তা গবেষণায় কাটে ,  ৮. আমার কথাবার্তা যেনো  হয় উপদেশমূলক ,  ৯. আমার প্রতিটি দৃষ্টি  যেনো হয় শিক্ষা গ্রহণকারী  ।  এ ছাড়া ও আমার প্রভু  আমাকে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ  নির্দেশ দিয়েছেন,  সেগুলো হলো :  ১. আমি যেনো ভালো  কাজের আদেশ করি এবং  ২. মন্দ কাজ থেকে নিষেধ  করি। ( সহীহ বুখারী ) 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন